Tuesday, October 14, 2014

দুই বিঘা জমি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে ।
বাবু বলিলেন , ‘ বুঝেছ উপেন , এ জমি লইব কিনে । ‘
কহিলাম আমি , ‘ তুমি ভূস্বামী , ভূমির অন্ত নাই ।
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো – জোর মরিবার মতো ঠাঁই । ‘
শুনি রাজা কহে , ‘ বাপু , জানো তো হে , করেছি বাগানখানা
পেলে দুই বিঘে প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা —
ওটা দিতে হবে । ‘ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে , ‘ করুণ বক্ষে গরিবের ভিটেখানি ।
সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া ,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া ! ‘
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে ,
কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে , ‘ আচ্ছা , সে দেখা যাবে । ‘
পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে —
করিল ডিক্রি , সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে ।
এ জগতে , হায় , সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি —
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি ।
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে ,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে ।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য
কত হেরিলাম মনোহর ধাম , কত মনোরম দৃশ্য !
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি ।
হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো – ষোলো —
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হল ।
নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি !
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর , জীবন জুড়ালে তুমি ।
অবারিত মাঠ , গগনললাট চুমে তব পদধূলি ,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি ।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল — নিশীথশীতল স্নেহ ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে —
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান , চোখে আসে জল ভরে ।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে —
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে ,
রাখি হাটখোলা , নন্দীর গোলা , মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে ।
ধিক্‌ ধিক্‌ ওরে , শতধিক্‌ তোরে , নিলাজ কুলটা ভূমি !
যখনি যাহার তখনি তাহার , এই কি জননী তুমি !
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা !
আজ কোন্‌ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ —
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা , পুষ্পে খচিত কেশ !
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন —
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী , হাসিয়া কাটাস দিন !
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন !
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি , ক্ষুধাহরা সুধারাশি !
যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী , হলে দাসী ।
বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি —
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে , সেই আমগাছ একি !
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা ,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক – কালের কথা ।
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম ,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম ।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর , পাঠশালা – পলায়ন —
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন !
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে ,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে ।
ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা ,
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা ।
হেনকালে হায় যমদূত – প্রায় কোথা হতে এল মালী ,
ঝুঁটি – বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি ।
কহিলাম তবে , ‘ আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব —
দুটি ফল তার করি অধিকার , এত তারি কলরব ! ‘
চিনিল না মোরে , নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ —
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ – সাথে ধরিতেছিলেন মাছ ।
শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন , ‘ মারিয়া করিব খুন ! ‘
বাবু যত বলে পারিষদ – দলে বলে তার শতগুণ ।
আমি কহিলাম , ‘ শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয় ! ‘
বাবু কহে হেসে , ‘ বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয় । ‘
আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি , এই ছিল মোর ঘটে —
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ , আমি আজ চোর বটে !

মানুষ – কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সল কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুদায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি তো সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুদার মানিক জ্বলে!
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’


মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে ‘বাবা, আমি ভুকা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা – “ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – তা’ হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুদার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!”


কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড় ;

ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার !

খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা ?

সব দ্বার এর খোলা র'বে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা !

হায় রে ভজনালয়

তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয় !

মানুষেরে ঘৃণা করি

ও' কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি

ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে

যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে ।

পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !--মুর্খরা সব শোনো

মানুষ এনেছে গ্রন্থ,--গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো ।

আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ

কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,

আমাদেরি এরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে

তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে !

আমরা তাঁদেরি সন্তান , জ্ঞাতি , তাঁদেরি মতন দেহ

কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ ।

হেস না বন্ধু ! আমার আমি সে কত অতল অসীম

আমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম ।

হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,

কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা ?

কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি ?

হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি !

অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,

আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ - দহে,

তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজানালয়

ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয় !



হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর -বাসে

জন্মিছে কেহ-জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে !

যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে

আজিও বিশ্ব দেখেনি--হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে !





ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য জীব !

ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব ।

আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,

তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী পাঠ ।

রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে !

হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে !

চাষা বলে কর ঘৃণা !

দেখো চাষা রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না !

যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারও ধরিল হাল

তারাই আনিল অমর বাণী--যা আছে র'বে চিরকাল ।

দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,

তারি মাঝে কবে এলো ভোলা -নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি !

তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে

দ্বার দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলৈ ।

সে মোর রহিল জমা -

কে জানে তোমারে লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কি না ক্ষমা !

বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু'চোখ স্বার্থ ঠুলি,

নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলী ।

মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা মথিত সুধা

তাই লুটে তুমি খাবে পশু ? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা ?

তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে

তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে !

তোমারি কামনা-রাণী

যুগে যুগে পশু ফেলেছে তোমায় মৃত্যু বিবরে টানি ।

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সকল মায়ের জন্য রইল শুভেচ্ছা এবং কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা)

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।
সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।
ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,
কোনোখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপন-মনে তাই
ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’
আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’
এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’
ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,
‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’
তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’
আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে,
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’
কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’

কেউ কথা রাখেনি-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী
আর এলোনা
পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি।
মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর
খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে? একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা!
বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি
দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে-কোনো নারী।
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!

বসন্ত বন্দনা – নির্মলেন্দু গুণ

হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্রসঙ্গীতে যত আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা,—দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।
এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরন,
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে, মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কি আনন্দ জাগানিয়া।
এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,
যতই এড়াতে চাই তাকে, দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখানি
নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।
আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।

কৃষ্ণকলি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের ‘পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্‍‌ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্‍‌ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

একটি পাগল ছেলের গল্প



একটা গল্প শুনবেন। গল্প, শুধুই গল্প।
যে গল্পে থাকবে একটা পাগল ছেলে। যার
জীবনে উচ্চাকাংখা বলে কিছুই নেই।
যে বর্ষাকালে বারান্দায় প্রিয়জনের
সাথে বসে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ
শুনতে চায়।
পরীক্ষা ফেলে বৃষ্টিতে ভিজতে যায়।
মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে পালিয়ে কোথায়
চলে যায় কেউ জানে না। আর
থাকবে একটা মেয়ে, অতি সাধারন।
ছেলেটা ভীষন ভালবাসবে মেয়েটাকে।
যে ভালবাসা কখোনো কিছু
দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আর মেয়েটা?
মেয়েদের মন কবে কে বুঝতে পেরেছ?
সে কি চায় নিজেও তা জানবে না।
জানি এই গল্পের পরিনতি ভাল হবে না।
তবুও
ছেলেটা গল্পটা এগিয়ে নিতে চাইবে।
2
মেয়েটা কি তার সঙ্গ দেবে? অবশ্যই
দিবে। কারন মেয়েটাও
যে ভালবাসে ছেলেটাকে। মেয়েটা চায় তার
ভালবাসা প্রকাশ করতে। আর ছেলেটা চায়
ভালবাসা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে।
মুখের কথা দিয়ে নয়। ছেলেটা কিছুতেই
বুঝে উঠতে পারে না, “দিনের মধ্যে হাজার
বার ভালবাসি না বললে কি হয়?
ভালবাসা কি কমে যায়? ”কিন্তু
মেয়েটা বুঝতে চায় না। সারাক্ষণ
অপেক্ষায় থাকে। অন্তত একবারের জন্য
হলেও ছেলেটা তাকে বলুক। বলুক,
“ভালবাসি, শুধুই তোমাকে।“ ছেলেটার
মুখের এই ছোট্ট বাক্যটাই তার সকল
প্রেরণা। তাইতো সকাল দুপুর সন্ধা নেই
ফোনের পর ফোন দিয়ে যায়। শুধু একবার
ভালবাসি শোনার অপেক্ষায়। দুইজনের
অনুভুতি, দুই জনের চাওয়া পাওয়া সবই
ভিন্ন। তারপরও গল্পটা এগিয়ে চলে।
হাসি, কান্না, আনন্দ, ব্যাথা-বেদনার
মিশ্রনে।
3
এটা একটা পাগল ছেলের গল্প।
পাগলামি না করলে কি চলে? শুরু হয় তার
পাগলামী। হটাৎ করেই সে যোগাযোগ
বন্ধ করে দেয় মেয়েটার সাথে।
“ভালবাসি ভালবাসি বলে চিৎকার
করাটা তার লোক
দেখানো মেকি মনে হয়।“ যোগাযোগ
বন্ধ করে দিলে কি হবে, তার
প্রতিটা স্বপ্ন জুড়ে থাকে মেয়েটা। তার
প্রতিটা কাজের
প্রেরণা হয়ে থাকে মেয়েটা। তার
অনুভুতি জুড়ে তার অস্তিত্ব জুড়ে শুধু
সেই মেয়েটা আর মেয়েটা। আর মেয়েটার
কি খবর?
ছেলেটাকে হাড়িয়ে সে পাগল প্রায়। খায়
না ঘুমায় না এমন কি বেঁচে থাকতেও চায়
না। তবুও বেঁচে থাকতে হয়। জীবনের
প্রয়োজনে। সময় গড়িয়ে যায়। মাসের পর
মাস, বছরের পর বছর।
ছেলেটা ভুলতে পারে না মেয়েটাকে।
তাকে নিয়েই ভাবে। তাকে নিয়েই স্বপ্ন
দেখে।
তারপর?

4
না, এটা একটা গল্প। বাস্তব কিছু নয়।
গল্পের মেয়েরা একটু অন্য রকম হয়। তাই
মেয়েটা ছেলেটাকে আবার ফোন করে।
কথা হয় দুজনার। তারা ভুলে যায়
মাঝখানে কয়েক বছর পার হয়ে গেছে।
জীবন
থেকে তারা হাড়িয়ে ফেলেছে অনেক
মুল্যবান
সময়। সেই সময়ের
প্রয়োজনে ছেলেটা হাড়িয়ে ফেলেছে তার
ভালবাসা। হাড়িয়ে ফেলেছে তার প্রানের
প্রিয়াকে। মেয়েটা আর তার নেই।
বিয়ে করেছে তার পছন্দের ছেলেটাকে।
যে তার খবর নেয়। দিনের মধ্যে হাজার বার
ভালবাসি ভালবাসি বলে তার পায়ে লুটায়।
ছেলেটার আকাশে আজ মেঘের ঘনঘটা।
যখন তখন বৃষ্টি নামে। তার
এলোমেলো জীবনটা আরো এলোমেলো হয়ে যায়।
তবুও সে মেয়েটার ভাল চায়।
চাইবে না কেন, দোষটাতো মেয়েটার না।
সেই-তো যোগাযোগ বন্ধ করেছিল।
নিজের দোষে নিজেকে ছাড়া আর
কাউকে তো শাস্তি দেয়া যায় না।
তাইতো নতুন করে নতুন ভাবে বাঁচতে চায়
সে। যেহেতু এটা গল্প। তাই শেষ হয়েও
শেষ হয় না।

5
কোন একদিন গভীর রাতে ছেলেটার
ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই সে শুধু
কান্নার শব্দ শুনতে পায়। মেয়েটা কাঁদছে।
কাঁদছে তো কাঁদছেই।
কান্না জড়ানো কন্ঠেই মেয়েটা বলে,
“আমি জানি আমার ফেরার পথ নেই। তবু
একটা কথা বলতে চাই। আমি শুধু
তোমাকে ভালবাসি। শুধুই তোমাকে। আর
কাউকে নয়। কোন দিন কাউকে বাসতেও
পারব না।“ ফোন কেটে যায়।
একাকী ছেলেটা জেগে থাকে। দু
চোখে বৃষ্টি নামে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়,
যা হবার তাই হবে। এভাবে কষ্ট পাওয়ার
মানে হয় না। কথা বলে মেয়েটার সাথে।
মেয়েটা সাড়া দেয় আগের মত। দুজন
দুজনকে পেতে চায় আপন করে।
কিন্তু সমাজ?
মেয়েটাই এগিয়ে আসে এর সমাধানে।
সে বিয়ে করেছে ঠিক। তবে একদিনও
স্বামীর ঘর করেনি। সে তালাক
দিয়ে দিবে স্বামীকে। তারপর দুজন
পালিয়ে যাবে। ঘর পালানো ছেলেটার
কাছে কাজটা সহজই মনে হয়।
তারপর?
তার আর পর নেই। ছেলেটা অপেক্ষায়
থাকে মেয়েটার। মেয়েটা ফোন দেয় না।
ছেলেটা ফোন দেয়। মেয়েটা ফোন ধরে না।
ছেলেটা আবার ফোন দেয়। মেয়েটা ধরে না।
ধরে না………………।
পরিশিষ্ট: গল্পটা শেষ। ছেলেটার
সাথে মেয়েটার আর কোনদিন দেখা হয়
নি। হয়ত
কোনদিন হবেও না। হয়ত মেয়েটা তার
স্বামী সংসার নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছে।
কিন্তু
মাঝরাতে মেয়েটার বলা একটা বাক্য
ছেলেটাকে আজ পাগল করে দিয়েছে।
আজও
তার কানে বাজে, “আমি জানি আমার
ফেরার পথ নেই। তবু একটা কথা বলতে চাই।
আমি তোমাকে ভালবাসি। শুধুই
তোমাকে। আর কাউকে নয়।“